১৯৮ শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ, কোটি টাকার আর্থিক অসঙ্গতি শনাক্ত; ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা চেয়েছে ডিআইএ
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর অন্যতম পরিচিত বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে একাধিক গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) এক অডিট প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে কলেজটির শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে আর্থিক লেনদেন পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, বিধিমালা ও প্রশাসনিক নিয়ম অনুসরণ না করার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
অডিটে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, কলেজটির অনুমোদিত ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগে বিধি অনুসরণ করা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং নিয়ম লঙ্ঘন করে নগদ অর্থ ব্যয়, ভ্যাট ও আয়কর যথাযথভাবে পরিশোধ না করা এবং গভর্নিং বডির সদস্যদের নিয়মবহির্ভূতভাবে সম্মানী প্রদানের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে ডিআইএ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অডিট প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যে পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
অডিটে বলা হয়েছে, কলেজে বর্তমানে ১৯৮টি অনুমোদিত শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগে গুরুতর প্রক্রিয়াগত ত্রুটি রয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথম দফায় নিয়োগ পাওয়া ১০০ জন শিক্ষকের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়োগ বিধিমালার সব শর্ত পূরণ করা হয়নি। বিশেষ করে নিয়োগ বোর্ডে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) অথবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধির উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি বৈধ নিয়োগ কমিটি গঠন এবং গভর্নিং বডির আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের নথিও অডিট দলের কাছে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে আরও পাঁচজন শিক্ষকের নিয়োগ নিয়ে অডিটের পর্যবেক্ষণ আরও কঠোর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, সাক্ষাৎকার গ্রহণ কিংবা নিয়োগ বোর্ড গঠনের মতো মৌলিক ধাপগুলোরও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কারণে এসব নিয়োগকে বিধিবহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে অডিটে অনিয়মের অভিযোগ ওঠা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি নয়। কলেজ কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা, উপস্থাপিত নথিপত্র এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়নের পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হবে।
অডিট প্রতিবেদনে শিক্ষক পদোন্নতির বিষয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অনুমোদিত জনবল কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট নীতিমালার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত সংখ্যক শিক্ষককে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চতর গ্রেডে বেতন-ভাতা দেওয়ার বিষয়টিও অডিটে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।
শুধু নিয়োগ নয়, আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও একাধিক অসঙ্গতির তথ্য উঠে এসেছে। তদন্তে বলা হয়েছে, ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে নগদ অর্থ থেকে ৭২ লাখ ৭৭ হাজার টাকার বেশি ব্যয় করা হয়েছে, যা সরকারি আর্থিক বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এছাড়া বিভিন্ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে উৎসে ভ্যাট ও আয়কর যথাযথভাবে কর্তন ও সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। অডিটে এ খাতে ৩১ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব অনিয়মের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে গভর্নিং বডির সদস্যদের প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকার সম্মানী দেওয়া হয়েছে। ডিআইএর মতে, প্রচলিত বিধিমালায় এ ধরনের অর্থ গ্রহণের সুযোগ নেই। ফলে সংশ্লিষ্ট অর্থের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অডিট দল পরিদর্শনের সময় কলেজের একাধিক প্রশাসনিক, আর্থিক ও একাডেমিক নথি পর্যালোচনা করতে চাইলেও সব নথি তাদের সামনে উপস্থাপন করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চলমান কিছু মামলায় কলেজ তহবিল থেকে ব্যয়ের তথ্য-প্রমাণও অডিট দল পুরোপুরি যাচাই করতে পারেনি।
এসব পর্যবেক্ষণের বিষয়ে নথিপত্র ও প্রমাণসহ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে কলেজ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে ডিআইএ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জবাব পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষা প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের বড় ও সুপরিচিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের অভিযোগ উচ্চশিক্ষা খাতে সুশাসন, জবাবদিহি এবং আর্থিক স্বচ্ছতার বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
তাদের মতে, শিক্ষক নিয়োগ ও আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
অডিট প্রতিবেদন কোনো চূড়ান্ত রায় নয়; এটি একটি প্রশাসনিক পর্যালোচনার অংশ। এখন কলেজ কর্তৃপক্ষের জবাব, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে পরবর্তী পদক্ষেপ। সেই সিদ্ধান্তই বলে দেবে অডিটে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পরিণতি কী হবে এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই অডিট কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
MD.RIMON AL FAHAD
Copyright © 2026 Desh Investigation. All rights reserved.