মিয়ানমারের অফশোর গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গ্যাস আনার প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় এলেও প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন। কারণ, প্রস্তাবিত পাইপলাইন যে অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার কথা, সেই রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এখন আরাকান আর্মির (এএ) হাতে বলে দাবি করছেন আঞ্চলিক বিশ্লেষকেরা। সূত্র: বার্মা নিউজ
তাদের মতে, মিয়ানমারের শ্বে গ্যাস প্রকল্প থেকে গ্যাস এনে চট্টগ্রামে সরবরাহ করতে হলে শুধু মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সমঝোতা যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রকল্পের বাস্তবায়নে রাখাইন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি আরাকান আর্মির সম্মতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গত ২ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ইউ কিয়াও সোয়ে মোয়ের মধ্যে বৈঠকের পর বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।
বৈঠকে বাংলাদেশ মিয়ানমারের অফশোর শ্বে গ্যাস প্রকল্প থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে আনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। দেশের চলমান জ্বালানি চাহিদা মোকাবিলায় এই গ্যাস ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুধু অর্থনৈতিক বা কারিগরি বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাখাইনের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা।
আরাকানবিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইউ মিয়ো কিয়াওয়ের দাবি, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা-সহ রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। ফলে রাখাইনের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো আন্তঃসীমান্ত অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে এএ’র সম্মতি প্রয়োজন হতে পারে।
২০২৪ সালের শুরু থেকে বুথিডং ও মংডোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত শহর এবং চিন রাজ্যের পালেটওয়া টাউনশিপেও আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর ফলে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন ট্রানজিট রুটের ওপরও তাদের প্রভাব তৈরি হয়েছে।
তবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিত্তে ও কিয়াউকফিউয়ের আশপাশে এখনো সংঘাত চলমান রয়েছে।
চলমান সংঘাতের মধ্যেও কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করছেন, প্রকল্পটি আরাকান আর্মির জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ডেভেলপমেন্ট মিডিয়া গ্রুপের প্রধান সম্পাদক ইউ অং মিন উ-এর মতে, স্থানীয় জনগণ যদি সরাসরি অর্থনৈতিক সুবিধা পায় এবং প্রকল্পের মাধ্যমে আরাকান আর্মি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছুটা অবস্থান তৈরি করতে পারে, তাহলে সংগঠনটি এমন উদ্যোগে সমর্থন দিতে পারে।
তার মতে, রাখাইন ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে গ্যাস বা তেল পরিবহনের মতো কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে আরাকান আর্মির কোনো না কোনো মাত্রার স্বীকৃতি প্রয়োজন হতে পারে। পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করে এমন বিদেশি বিনিয়োগের প্রতি সংগঠনটির আগ্রহ থাকতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
আরাকান আর্মির প্রধান কমান্ডার মেজর জেনারেল তুয়ান ম্রাত নাইং এর আগে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তবে বাংলাদেশ সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ এখনো সীমিত।
ফলে মিয়ানমারের গ্যাস চট্টগ্রামে আনার প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু গ্যাসের উৎস, পাইপলাইন নির্মাণ কিংবা অর্থায়নের বিষয় নয়—রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে সম্ভাবনাময় এই প্রকল্প সামনে এগোতে হলে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পাশাপাশি রাখাইন অঞ্চলের বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।