নিজস্ব প্রতিবেদক
পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। তবে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ক্রমবর্ধমান চাপ, ভবিষ্যতের যোগাযোগ চাহিদা এবং অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের কথা বিবেচনায় নিয়ে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। সম্ভাব্য স্থান হিসেবে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া নৌপথকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ, কারিগরি প্রস্তুতি এবং অন্যান্য প্রাথমিক কার্যক্রম নিয়ে কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পদ্মা সেতুই প্রধান ভরসা। কিন্তু ভবিষ্যতে যানবাহনের সংখ্যা আরও বাড়বে। একটি মাত্র সেতুর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বড় ধরনের সংস্কারকাজের সময় বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাদের মতে, দ্বিতীয় একটি সেতু নির্মিত হলে বিকল্প করিডোর তৈরি হবে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও নিরবচ্ছিন্ন হবে এবং দক্ষিণ ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যাতায়াত সহজ হবে।
সেতু–সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের মধ্য ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জেলার জন্য দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটটি ভৌগোলিকভাবে বেশি সুবিধাজনক। এ রুটে সেতু নির্মিত হলে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, যশোর, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলার সঙ্গে রাজধানীর দূরত্ব ও ভ্রমণের সময় কমবে।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম ব্যস্ত ফেরি রুট হিসেবে পরিচিত দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট ও ফেরির অপেক্ষায় থাকতে হয়। নতুন সেতু নির্মিত হলে সেই ভোগান্তিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু শুধু যোগাযোগ সহজ করবে না, বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠতেও ভূমিকা রাখবে।
উন্নত সড়ক যোগাযোগ বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পকারখানা স্থাপন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি কৃষিপণ্য, মাছ, সবজি ও শিল্পপণ্য দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা সম্ভব হবে। এতে পরিবহন ব্যয় কমবে এবং রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে আরও গতি আসবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতু প্রকল্প বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর একটি। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সমীক্ষার মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয়, কারিগরি সক্ষমতা এবং বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি বৈদেশিক অর্থায়নের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং এখন অর্থায়ন ও অন্যান্য প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা চলছে। তিনটি সম্ভাব্য রুট বিবেচনায় থাকলেও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিল্পায়ন, পর্যটন ও বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে।